সাম্প্রতিক

6/recent/ticker-posts

এক মাছই ৩০০ কেজি, দেশে শুরু হচ্ছে মেকং পাঙ্গাসের চাষ

thai mekong giant Pangasius

প্যাঙ্গাস হলো ক্যাটফিশ জাতীয় মাছ। স্বাদু পানির এই মাছ- ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস এবং থাইল্যান্ডের মেকং অববাহিকা, চাও ফ্রায়া এবং মেকলংয়ে কয়েক শতাব্দী ধরে স্থানীয় মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উৎস হয়ে রয়েছে। ২০০০ সালের পর এই মাছ ব্যাপকভাবে চাষ শুরু হয়। ইউরোপের কিছু দেশে রপ্তানি শুরু হলে মানুষ নদীতে পুকুরে নিবিড়ভাবে পাঙ্গাস চাষ শুরু করে। দ্রুতই সবচেয়ে বেশি চাষকৃত মাছের প্রজাতিহয়ে ওঠে এই ক্যাটফিশ।

আন্তর্জাতিক বাজারেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লেও খুব বেশি দিন এর জনপ্রিয়তা টিকেনি। এক সময় পাঙ্গাসের মাংস, হিমায়িত এবং ফিলেট ইউরোপের সুপারমার্কেটগুলোর তাক, স্কুল ক্যাফেটেরিয়া এবং রেস্তোরাঁর টেবিলে সাধারণ খাবার হিসেবেই পরিবেশন করা হতো। কিন্তু নানা কারণেই পড়ে ভাটা পড়েছে।

পাঙ্গাস দ্রুত বাড়ে, চাষে খুব কম খরচ হয় এবং মোটামুটি স্বাদের মাছ। সহজে ও কম খরচে চাষ করা যায় বলে রাতারাতি এই মাছে চাষ বেড়ে গিয়েছিল। বিদেশে রপ্তানি শুরু হলে অনেকের আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত হয় পাঙ্গাসের খামার।

তবে এই মাছের কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে: পাঙ্গাসের পুষ্টিগুন কম। এতে ওমেগা-৩ খুব কম। একটি থাকা কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ, পুষ্টিবিদেরা মাছ খাওয়ার পরামর্শ দেনই মাছে এই ফ্যাটি অ্যাসিডের উপস্থিতির কারণে। 

এ ছাড়া পাঙ্গাসের প্রাকৃতিক প্রজনন স্থানগুলো বিশ্বের অন্যতম দূষিত নদীগুলোর একটিতে অবস্থিত। নদীর এই দূষণ তাদের স্বাস্থ্যের ওপর কোনো ফেলছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আর নদী দূষণের কারণে পাঙ্গাসের স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানুষেরও স্বাস্থ্যগত ক্ষতির ঝুঁকি থাকে।

ইউরোপে পাঙ্গাসের প্রধান বাজার স্পেন, এই দেশ ২০১৫ সালে ভিয়েতনাম থেকে ৪ কোটি ৭৬ লাখ ইউরোর বিনিময়ে ২৩ হাজার ১৭৯ টন পাঙ্গাস কিনেছিল। পরে অবশ্য চাহিদা কিছুটা কমে গেছে। একেবারে সাম্প্রতিকালে স্পেনে পাঙ্গাসের বিক্রি আরও কমতে শুরু করেছে।

যাইহোক, মানুষের স্বাস্থ্যের বিষয়ে বিজ্ঞানিদের সম্প্রদায়ের আশ্বাস এবং আমদানিকৃত পাঙ্গাসের অসংখ্য বিশ্লেষণেও রাসায়নিক দূষণ, অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ বা অন্যান্য দূষণকারী পদার্থের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ সত্ত্বেও স্পেনের সুপারমার্কেটগুলো পাঙ্গাস বিক্রি বন্ধ করে দিচ্ছে। 

এটির প্রধান কারণ পরিবেশ দূষণ। এশিয়ায় পাঙ্গাসের খামারগুলো ব্যাপকভাবে পরিবেশ দূষণ করে। গ্রিনপিসের মতো পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বলছে, পাঙ্গাসের চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে আরও বেশি নিবিড় উৎপাদন প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে আরও বেশি দূষণের ঝুঁকিতে পড়ছে পরিবেশ। বিশেষ করে ম্যানগ্রোভের মতো সংরক্ষিত অঞ্চলগুলোকে বিপন্ন হয়ে উঠছে। এর প্রধান কারণ, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস এবং থাইল্যান্ডের মতো দেশে পাঙ্গাস চাষ করা হয় উন্মুক্ত নদীতে।

এসব কারণে সম্প্রতি ইতালিতে স্কুলের ক্যান্টিনে পাঙ্গাসের বদলে স্থানীয় সামুদ্রিক মাছ সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে স্থানীয় স্থানীয় অর্থনীতির উপকার হচ্ছে, সেই সঙ্গে স্কুলের শিশুরা আরও পুষ্টি পাচ্ছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ দেখেছে, ক্যান্টিনে সামুদ্রিক মাছ দিলে বর্জ্যের পরিমাণ ৫৪ শতাংশ থেকে কমে ৮ শতাংশে নেমেছে।

তবে বাংলাদেশে সাধারণত বদ্ধ জলাশয় বা পুকুরে পাঙ্গাস চাষ করা হয়। ফলে সেভাবে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি কম থাকে। এই মাছ কম খরচে দ্রুত বড় করা যায় বলে দেশে মাছের চাহিদার একটি অংশই পূরণ করছে পাঙ্গাস। 

এর মধ্যে দেশে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছে থাই পাঙ্গাস বা মেকং পাঙ্গাস। এই জাতের পাঙ্গাস ৩০০ কেজি পর্যন্ত হয়।  বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটে অবশ্য ১২০ কেজি পর্যন্ত ওজন হয়েছে। 

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রজাতির মহাবিপন্ন এই মেকং জায়ান্ট পাঙ্গাস নিয়ে আশা দেখছেন দেশের বিজ্ঞানীরা। এর কৃত্রিম প্রজনন সফল হলে ব্যাপকভাবে চাষ করা সম্ভব হবে।

এই জাতের পাঙ্গাস বাংলাদেশে আসে ২০০৬ সালে থাইল্যান্ড থেকে। ত্রিশালের একটি হ্যাচারিতে এগুলো চাষ করা হয়। ২০১৫ সালে এর মধ্যে ৫০টি নেওয়া হয় বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) গবেষণা পুকুরে। 

মেকং জায়ান্ট পাঙ্গাস মূলত মেকং নদীর একটি মাছ। মেকং নদী চীন, লাওস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম হয়ে ইয়োলো সাগরে পড়েছে। সেই নদী থেকে এই মাছটি নিয়ে এসেছিলেন ত্রিশালের রেনি ফিসারিজের কর্ণধার রেজা আলী। 

বিএফআরআইয়ের পুকুরে এখন ১৭ বছর বয়সী ৪৭টি মেকং পাঙ্গাস আছে। এগুলোর ওজন ১০০ থেকে দেড়শ কেজি। এই মাছ তার জীবৎকালের ১৭ থেকে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত বছরে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি ডিম দেয়। 

মেকং পাঙ্গাস প্রাপ্তবয়স্ক হলে প্রতিদিন ৫ ভাগ বডিবেজ খাবার খায়। অর্থাৎ ১০০ কেজি ওজন হলে প্রতিদিন ৫ কেজি খাবার দিতে হবে। 

কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন সম্ভব হলে,এই মাছের পোনা মাত্র ১ বছরে ৯ থেকে ১২ কেজি ওজনের হয়। সে হিসাবে দেশি পাঙ্গাসের তুলনায় ৬ গুন বেশি বাড়ে। 

প্রথম দিকে মেকং পাঙ্গাস কার্নিভরাস বা মাংসাশী থাকলেও এক বছর বয়সের পর তৃণভোজি হয়ে ওঠে। এরা নদীতে পেরিফাইডন, শ্যাওলা এবং পাথরে গায়ে লেগে থাকা শ্যাওলা খেয়ে জীবনধারণ করে। তাই আফ্রিকান মাগুরের মতো এই মাছ ক্ষতিকর হবে না। পুকুর থেকে নদীতে বা উন্মুক্ত জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়লেও ভয় নেই।

দেশে বর্তমানে পাঙ্গাসের উৎপাদন বছরে সাড়ে ৪ লাখ টন। তবে মেকং পাঙ্গাস চাষ শুরু হলে দেশে মাছ চাষে নতুন বিপ্লবের সূচনা হবে বলেই আশা করা যায়। 

Post a Comment

0 Comments