সাম্প্রতিক

6/recent/ticker-posts

টমেটো সংরক্ষণ পদ্ধতি: খেতে পারবেন সারা বছর

how to store tomato

পাকা টমেটো ঘরে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ১ সপ্তাহ পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। আবার বিকল্পভাবে, ফ্রিজে সংরক্ষণ করা যায় দুই সপ্তাহ পর্যন্ত। আর দীর্ঘ সময় রাখার জন্য টমেটোগুলোকে স্টোরেজ বিনে ৬ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব। নিচে টমেটো সংরক্ষণের কিছু উপায় বর্ণনা করা হলো:

ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ

সবুজ বা আধা পাকা টমেটো বাছাই করুন। আপনি যদি ঘরের তাপমাত্রায় এক সপ্তাহ বা তার বেশি সময় টমেটো সংরক্ষণ করতে চান তাহলে সঠিক বয়সের টমেটো বাছাই করা জরুরি। সবুজ টমেটো কিনে ঘরে রাখুন, ধীরে ধীরে এটি পেকে যাবে।

একটি স্টোরেজ বিনে (বাঁশ বা বেতের ঝুড়ি) না ধোয়া টমেটো রাখুন। টমেটোগুলো সংরক্ষণ করতে বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন। একটি পদ্ধতি হলো: এগুলোকে একটি ঝুড়িতে লেয়ার করে রাখা, দুটি স্তরের মাঝখানে সংবাদপত্র বা নিউজপ্রিন্ট কাগজ বিছিয়ে রাখুন।

বিকল্প পদ্ধতি হলো, শক্ত কাগজের মোড়কের বা ফল রাখার কাগজের বাক্সে প্রতিটি টমেটো আলাদা করে পত্রিকার কাগজ দিয়ে মুড়িয়ে রাখুন। টমেটো ভরানোর পর বাক্সটি বন্ধ করে রাখুন।

এভাবে টমেটো অন্ধকার ও ঠান্ডা জায়গায় ৬ মাস পর্যন্ত টমেটো সংরক্ষণ করা যায়। এমন স্থানে বাক্সগুলো রাখুন যে স্থানটি সাধারণত ব্যবহৃত হয় না। খেয়াল রাখুন সেখানে যেন সরাসরি সূর্যের আলো না ঢোকে।

সপ্তাহে অন্তত একবার টমেটোগুলো পরীক্ষা করুন। পচে যাওয়া টমেটো সরিয়ে ফেলুন। বাকি টমেটোগুলো উলটপালট করে দিন। 

খাওয়ার জন্য পাকা টমেটো পেতে ১-২ দিন আগে প্রয়োজন মতো টেমেটো বের করে রোদ পড়ে এমন একটি উষ্ণ জায়গায় রাখুন। তাহলে ভালোমতো পেকে যাবে।  যেসব টমেটো আগেই কিছুটা লাল ছিল সেগুলো আগে খেয়ে ফেলুন। সবুজগুলো দেরিতে খেতে পারবেন।

টমেটো শুকিয়ে সংরক্ষণ

পাকা টমেটো ভালোভাবে ধুয়ে অর্ধেক টুকরো করে নিন। ধারালো ছুরি দিয়ে লম্বালম্বি দুই ভাগ করতে হবে। 

এরপর বীজ এবং মাঝের মাংস সরিয়ে ফেলুন। একটি ধারালো ছুরি দিয়ে টমেটোর মাঝ বরাবর অংশটি কেটে ফেলতে পারেন। বীজ অপসারণের জন্য আঙ্গুল ব্যবহার করুন। খোসা ছাড়ানোর দরকার নেই, তবে শুকিয়ে গেলে এগুলো কুঁচকে যায়, দেখতে খারাপ লাগে।

এবার কাটা টমেটোগুলো একটি শুকনো বাঁশের বা বেতের ট্রেতে কাটা অংশ উপরের দিকে রেখে সাজিয়ে নিন। টিনের উপরও শুকাতে পারেন। টমেটোগুলো গায়ে গায়ে রেখে শুকাতে দিতে পারেন কারণ শুকানোর পর এগুলো কুঁকড়ে ছোট হয়ে আসবে।

এই শুকানোর কাজটি আপনি ডিহাইড্রেটর দিয়েও করতে পারেন। অথবা ওভেনেও শুকানো যেতে পারে। ওভেনে শুকানোর জন্য টমেটোগুলো বেকিং শিটে নিতে হবে।

৫৭° C তাপমাত্রায় টমেটো ডিহাইড্রেট করুন। প্রায় ৪ ঘণ্টা এই তাপমাত্রায় ডিহাইড্রেট হতে দিন। 

আর যদি ওভেনে টমেটো শুকিয়ে নিতে চান তাহলে তাপমাত্রা ৬৬°C সেট করুন। টমেটো যাতে এই তাপমাত্রায় থাকে তা নিশ্চিত করতে ওভেন থার্মোমিটার ব্যবহার করুন। 

৩-৪ ঘণ্টা পর টমেটোগুলো উলটে পালটে দিন। টমেটো উল্টাতে একটি স্প্যাটুলা ব্যবহার করুন। এছাড়া, ট্রেগুলোও ঘুরিয়ে দিন, কারণ বেশিরভাগ ডিহাইড্রেটর এবং ওভেন পুরো জায়গাজুড়ে সমানভাবে তাপ দিতে পারে না।

প্রথমবার এই উলট পাল্ট করার পরে প্রতি ঘণ্টায় টমেটোগুলো উলটে পালটে দিন।

কুঁচকানো চামড়ার মতো টেক্সচার চলে এলে বুঝবেন টমেটোগুলো ঠিকঠাক শুকিয়ে গেছৈ। টমেটো এমনভাবে শুকাতে হবে যে হাত দিলে নরম মনে হবে এবং বাঁকানো বা ভাঁজ করা যাবে। ভাঁজ করতে গেলে ভেঙে যাবে এমনভাবে শুকানো ঠিক নয়।

হাত দিয়ে দেখুন টমেটোগুলো আঠালো মনে হচ্ছে কি না। তেমন মনে হলে আরও শুকাতে হবে। চেপে ধরলে কোনো রস বের হচ্ছে কিনা সেটিও খেয়াল করুন।

যদি কোনও টমেটো খুব বেশি খাস্তা (মচমচে) হয়ে যায়, তাহলে সেগুলো সরিয়ে ফেলুন। এগুলো গুঁড়ো করে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। ব্যবহারের সময় পানি মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করে নিন।

প্রতি ঘণ্টায় এভাবে টানা ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত টমেটোগুলো উলটপালট করে দিন। অবশ্য  শীতকাল হলে বেশিরভাগ টমেটো ৬-৮ ঘণ্টার মধ্যে শুকিয়ে যায়। অবশ্য এটি নির্ভর করে টমেটো কত বড় এবং এগুলোর আর্দ্রতা কেমন তার উপর।

বিকল্প উপায় তাজা রাখুন

তেলে চুবিয়ে বা ডিপ ফ্রিজে রেখে এক বছর পর্যন্ত টমেটো রাখা যায়। রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজারে টমেটো সংরক্ষণ করতে চাইলে এগুলো একটি জিপ-টপ ব্যাগে রাখুন। জিপ লাগানোর আগে অতিরিক্ত বাতাস চেপে বের করে দিন। এভাবে এক মাস পর্যন্ত ফ্রিজে রাখা যায়।

তেলে টমেটো সংরক্ষণ করতে কাচের বয়াম নিন। বয়ামগুলো ১০ মিনিট ফুটন্ত পানিতে সিদ্ধ করে জীবাণুমুক্ত করুন। এরপর পানি ঝরিয়ে বয়ামগুলো শুকাতে দিন। টমেটোগুলো রেড ওয়াইন ভিনেগার বা শুধু ভিনেগারে ডুবিয়ে রাখুন। এরপর টমেটোগুলো বয়ামে ভরুন। টমেটোর উপরে তেল (যেমন, সরিষা বা অলিভ অয়েল) ঢেলে দিন যতক্ষণ না এগুলো পুরোপুরি তেলে ডুবে যায়। এবার কাচের জার বা বয়ামটি ভালোভাবে মুখ লাগিয়ে একটি ঠান্ডা, অন্ধকার জায়গায় রাখুন। প্রয়োজনের সময় টমেটো বের করে নিয়ে খেয়াল করুন, বাকি টমেটোগুলো ঠিকঠাক তেলে ডুবে আছে কি না।

হিমায়িত (ডিপ ফ্রিজ) টমেটো

টমেটো ধুয়ে বোঁটা কেটে নিন। টাটকা পানিতে টমেটো ধুয়ে নিন। অতিরিক্ত ময়লা অপসারণ করতে আঙ্গুল দিয়ে ঘষুন। মাঝের অংশটি ভালোভাবে কেটে ফেলুন। ট্যাপের পানি ছেড়ে দিয়ে টমেটো ধোয়া ভালো। তাতে জীবাণুমুক্ত হয়।

পরে অল্প পরিমাণে খাওয়ার জন্য বের করে নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে টমেটো টুকরো করে কেটে নিন।  ছুরি ব্যবহার করে টমেটোকে কোয়ার্টার বা অর্ধেক করে কেটে নিন। 

চাইলে ছোট আকারের টমেটো আস্তই হিমায়িত করতে পারেন।

টমেটোগুলো একটি বায়ুরোধী পাত্রে ভরে ফ্রিজে এক বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে পারবেন। 

ফ্রিজে রাখার আগে টমেটো খোসা ছাড়িয়ে নিতে পারেন। অবশ্য হিমায়িত টমেটোর একটি বোনাস হলো খোসা ছাড়ানো যায় সহজে। একবার ফ্রিজার থেকে টমেটো বের করে ফেললে, আঙ্গুল দিয়ে সহজেই খোসা ছাড়িয়ে নিতে পারবেন।

ক্যানিং টমেটো

টমেটোগুলো ভালো করে ধুয়ে নিন। ছুরি দিয়ে, প্রতিটি টমেটোর নিচে একটি ছোট x এর মতো করে হালকা চিড়ে দিন। এবার টমেটো ফুটন্ত পানিতে প্রায় আধা মিনিট ডুবিয়ে রাখুন। এরপর তুলে সঙ্গে সঙ্গে বরফ পানিতে ডুবিয়ে রাখুন। এতে খোসাগুলো খুব সহজে ছাড়িয়ে নিতে পারবেন। 

টমেটোর খোসা ছাড়িয়ে বীজ এবং অতিরিক্ত রস চেপে বের করে ফেলুন। ছুরি দিয়ে বোঁটা গভীর করে কেটে ফেলুন। এরপর অর্ধেক করে কেটে নিন। এরপর আঙ্গুল দিয়ে বীজ ছাড়িয়ে ফেলুন। 

একবার আপনি সমস্ত টমেটোর চামড়া ছড়ানো হলে, বীজ এবং চামড়াগুলো ভালোমতো পিষে পেস্ট বা পাল্প তৈরি করুন। সঙ্গে টমেটোর রস ও পানি যুক্ত করুন।

টমেটো পাল্প তৈরির জন্য পটেটো ম্যাশার ব্যবহার করতে পারেন। বেশি পাল্প তৈরির জন্য কিছু টমেটোও পিষে পেস্ট করুন।

এবার কাটা টমেটো এবং টমেটোর পাল্প জ্বাল দিন 

দুটি আলাদা পাত্রে টমেটো এবং টমেটো জল মাঝারি আঁচে চুলায় ফুটতে দিন। ফুটতে থাকলে আঁচ কমিয়ে দিন এবং টমেটো সিদ্ধ হয়ে ভেঙে যেতে শুরু করার আগে পর্যন্ত জ্বাল দিতে থাকুন।

চাইলে টমেটো রান্না করার আগে মশলা যোগ করতে পারেন। রসুন বাটা, পেঁয়াজ বা মরিচ, গরম মশলা, লবণ এবং মরিচ এবং/অথবা তুলসী বা রোজমেরির তাজা ডাঁটা ব্যবহার করে দেখতে পারেন। এসব নিজের রুচি অনুযায়ী ব্যবহার করাই ভালো।

টমেটো এবং টমেটোর জল সমান সময় পর্যন্ত রান্না করুন।

এবার ক্যান বা জারগুলো জীবাণুমুক্ত করুন। আপনি যখন টমেটো রান্না করছেন, তখনই পানি ফুটিয়ে নিন। ফুটানো পানিতে জার, ঢাকনা, রিং, ফানেল এবং চিমটি রাখুন। সেগুলোকে কয়েক মিনিটের জন্য ফুটতে দিন।

অন্তত ১০ মিনিট ফুটানোর পর সেগুলো চিমটা দিয়ে তুলে আনুন। ঠান্ডা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।

এবার জারে টমেটো ঢালুন এবং বুদবুদ বের করে দেওয়ার জন্য হালকা করে নাড়ুন। ফানেল দিয়ে টমেটো ঢাললে সুবিধা হয়। বয়ামের ১ ⁄ ২ ইঞ্চি  ফাঁকা রাখুন। কোনো বুদবুদ যেন থাকে তা নিশ্চিত করতে টমেটো ভর্তি জারে একটি পরিষ্কার ছুরি বা চপস্টিক ঢুকিয়ে হালকা নাড়া দিন। 

টমেটো জলের জন্যও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করুন।

বয়ামগুলো মোছার পর ঢাকনা লাগিয়ে দিন। একটি কাপড় দিয়ে বয়ামের রিমগুলো পরিষ্কার করুন যাতে ঢাকনাগুলো ঠিকঠাক সিল হয়। এরপর রিংগু লাগিয়ে দিন। 

এবার জারগুলো একটি প্রেসার কুকারে নিন। ১১ পাউন্ড (৫ কেজি) চাপ নিতে পারে এমন প্রেসার কুকার ব্যবহার করুন। প্রেসার কুকারে ঢাকনা দিয়ে উচ্চ তাপে জ্বাল দিন। বাষ্প বের হতে দেখলে আরও ১০ মিনিটের জন্য রান্না করুন। এবার প্রেসার কুকারের ঢাকনা লাগিয়ে দিন।  কুকারের চাপ ১১ পাউন্ড (৫ কেজি) পর্যন্ত পৌঁছাতে দিন। এই পর্যায়ে এলেই সিটি দিতে শুরু করবে। এই চাপে ১৫ মিনিটের জন্য টমেটো রান্না করুন।

এবার চুলা বন্ধ করুন। চাপ কমে আসার জন্য অপেক্ষা করুন। কুকার ঠান্ডা হয়ে গেলে এবং চাপ ছেড়ে দিলে, কভার লকটি খুলে ফেলু্ন। প্রেসার কুকারের ঢাকনা সাবধানে খুলুন এবং পাত্র থেকে জারগুলো বের করতে চিমটা ব্যবহার করুন, কারণ তখনো সেগুলো যথেষ্ট গরম থাকবে।

জারের ঢাকনা পরীক্ষা করুন। যখন জারগুলো কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরোপুরি ঠান্ডা হয়ে যায়, তখন দেখনে ঢাকনাগুলো টাইট হয়ে লেগে গেছে। তখন সাবধানে রিংগুলো খুলে ফেলুন। এই অবস্থায় এটি ফ্রিজে রাখুন। 

ফ্রিজ থেকে বের করে একটি শীতল, অন্ধকার এলাকায় সিল করা বয়ামগুলো রাখুন। এই টমেটো স্টু, স্যুপ এবং সসে ব্যবহার করতে পারবেন। আর ঝোলের মতো স্যুপে টমেটো জল ব্যবহার করতে পারেন।


Post a Comment

0 Comments