সাম্প্রতিক

6/recent/ticker-posts

আলুর ৯টি প্রধান রোগ ও প্রতিকার

আলুর প্রধান প্রধান রোগ, লক্ষণ ও প্রতিকার
আলুর রোগ
এমনিতেই মৌসুমে আলুর দাম পান না কৃষকরা। এর মধ্যে আজকাল আবহাওয়ার যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, একই সেই সঙ্গে রাসায়নিক সারের ব্যবহার বেড়েছে তাতে আলু ক্ষেত্রে রোগের আক্রমণও বাড়ছে। কৃষকদের সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে তারা দোকানদার বা ব্যবসায়ীদের পরামর্শে নানা কীটনাশক ব্যবহার করেন। এতে ফসল তো রোগমুক্ত হয়ই না উল্টো দোকানদার একাধিক কীটনাশকের কৌটা ধরিয়ে দিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়। কিন্তু কৃষক যদি প্রত্যেকটি রোগের লক্ষণ সম্পর্কে জানতেন তাহলে নিজেই সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করে সঠিক কীটনাশকটিই ব্যবহার করতে পারতেন। এমনকি তখন তিনি জৈব কীটনাশকও নিজেই তৈরি করতে পারতেন। এতে যেমন বাঁচতো খরচ তেমনি বাঁচতো পরিবেশ। সেই সঙ্গে ফসল ফলাতে গিয়ে অতিরিক্ত খরচের কারণে বিনিয়োগের টাকাটাই নাই হয়ে যেত না। নিচে আলুর প্রধান ৯টি রোগ নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

১. আলুর আগাম ধসা রোগ (early blight of potato)
Alternaria solani নামক ছত্রাকের আক্রমণে এই রোগ হয়। এটিকে আলুর মড়ক রোগও বলে। আলুর টিউবার,পাতা ও কান্ড এ রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। আক্রান্ত গাছের পাতায় কিছু কিছু স্থানে বৃত্তাকার অথবা গরুর চোখের মনির মতো দেখতে দাগ সৃষ্টি হয়। দাগগুলো কালো বা বাদামি রঙের হয়ে থাকে। আক্রান্ত গাছের কান্ডতেও এধরনের দাগ সৃষ্টি হয়। বয়স্ক পাতায় এই লক্ষণ প্রথমে দেখা যায়। রোগের ফলে আলুর আকৃতি ছোট হয়ে যায়। ফলন কমে যায়।

আলুর আগাম ধসা রোগ গাছের যে কোনো বয়সী পাতায় হতে পারে। আক্রান্ত পাতায় দাগ ও ক্ষয় (ব্লাইট, ধস) দেখা দেয়।
সাধারণ যখন আলু গুটি বাঁধতে শুরু করে এবং ‍গুটি বড় হতে থাকে তখন থেকে শুরু করে আলু সংগ্রহের আগে পর্যন্ত এ রোগ দেখা দিতে পারে।
আগাম ধসা রোগ প্রথম দেখা দেয় পুরাতন পাতায়। ছোট ছোট কালো ক্ষত দেখা দেয় পাতায়।
পরে ক্রমেই এ ক্ষত বা দাগ বড় হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে এক ইঞ্চির চার ভাগের এক ভাগ কিংবা তারও বড় হয়। রোগাক্রান্ত স্থানের মাঝখানে গরুর চোখের মতো একটি গোল প্যাটার্ন দেখা দেয়।
দাগের চারপাশের টিস্যুগুলো হলুদ রঙ ধারণ করে।
রোগাক্রান্তের সময় বেশি গরম এবং বাতাসের আর্দ্রতা বেশি থাকলে বেশিরভাগ পাতা বা পত্রগুচ্ছ মরে যায়।
শাখা-প্রশাখার ওপরও একই ধরনের ক্ষত দেখা দেয়।
আলুর আগাম ধসা রোগ
আগাম ধসা রোগের লক্ষণ

যেভাবে ছড়ায়
এ রোগের জীবাণু রোগাক্রান্ত গাছের অংশ বা মাটিতে কয়েক বছর পর্যন্ত অক্ষত থাকতে পারে। এটি বীজ আলুর মাধ্যমেও ছড়ায়।
এছাড়া এ ছত্রাকের স্পোর পানি, বাতাস, পোকামাকড়, অন্যান্য পশুপাখি, মানুষ এমনকি মেশিনারির মাধ্যমেও এক জমি থেকে আরেক জমিতে ছড়াতে পারে।
গরম, হালকা বৃষ্টি এবং আর্দ্র আবহওয়াতে এ রোগ বেশি হয়।

প্রতিকার
সঠিক পরিমাণে সার প্রয়োগ।
সময়মত সেচ প্রদান।
পাতায় দাগ দেখা দিলে ১ লিটার পানিতে ২ গ্রাম Mencozeb বা Iprodione গ্রুপের ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হবে।

২. আলুর বিলম্বিত ধসা রোগ (LATE BLIGHT OF POTATO)
এ রোগকে পটেটো ব্লাইট বা আলুর মড়কও বলে। ওয়াটার মোল্ড Phytophthora infestens ছত্রাক বা অ্যালগি এ রোগের জন্য দায়ী। যেসব এলাকায় বাতাসে আর্দ্রতা বেশি এবং তাপমাত্রা ৪ থেকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৪০-৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) সেসব এলাকায় এ রোগ বেশি হয়। তবে গরম কিন্তু শুষ্ক আবহাওয়ায় এ রোগের বিস্তার কমে যায়। এ রোগে আক্রান্ত আলু গাছ দুই সপ্তাহের মধ্যে মারা যায়।
আলুর মড়ক
আলুর মড়কের লক্ষণ
লক্ষণ
আক্রান্ত গাছের পাতায় বা কান্ডে কালো ও পানি শোষণকারী ফোস্কা সৃষ্টি হয়। এ ফোস্কাগুলোতে সাদা স্পোর দেখতে পাওয়া যায় যা বাতাস বা পানির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। মহামারী আকার ধারণ করলে সব ফসল নষ্ট হয়ে যায়।

আক্রান্ত গাছের পাতা, বোঁটা এবং শাখায় ক্ষত দেখা দেয়। গোল বা অনিয়মতি আকৃতির এ ক্ষতের রঙ হতে পারে ঘন সবুজ, বেগুনী কালো এবং অত্যধিক ঠান্ডায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে যে বর্ণ ধারণ করে তেমন হতে পারে।
ক্ষতর চারপাশে এবং পাতার নিচে সাদা পাউডারের মতো স্পোর দেখা যাবে।
আলুর গায়ে ১৫ মিলিটার গভীর পচন দেখা দিতে পারে।
আক্রান্ত আলুতে পরবর্তীতে অন্যান্য ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ হতে পারে। এতে পুরো আলুটিই পচে যাবে।

যেভাবে ছড়ায়
ফাইটোপথোরা জীবাণু গুদামে রাখা আলু, আবর্জনার স্তূপ, মাঠে আক্রান্ত আলুর গাছ এবং গ্রিনহাউজ টমেটো থেকে এ রোগ ছড়াতে পারে। এর স্পোর বাতাসের মাধ্যমে রোগাক্রান্ত গাছ থেকে সুস্থ গাছে ছড়াতে পারে। এমনকি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এভাবে সংক্রমণ ঘটতে পারে। আবহাওয়ার তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৫৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট) এর নিচে স্পোরের অঙ্গুরোদগম হয়। এরপর উপযুক্ত পরিবেশ পেলে (ঠান্ডা ও আর্দ্র আবহাওয়া) বংশবৃদ্ধি ঘটে। আক্রমণের চার থেকে ছয় দিনের মধ্যে গাছের পাতায় ধস বা ক্ষত দেখা দেয়। এ প্রক্রিয়া পর্যায়ক্রমে চলতে থাকে।

প্রতিকার
রোগমুক্ত বীজ বপন।
বীজ শোধনের জন্য Carbendazim 50WP ১লিটার পানিতে ৩ গ্রাম মিশিয়ে ১ কেজি বীজে ব্যবহার করতে হবে।
আক্রান্ত গাছ কেটে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
Mencozeb ৪গ্রাম/লিটার কিংবা Carbendazim 50WP ২ গ্রাম/লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

এ রোগের জীবাণু শরীরে পুরো দেয়াল তৈরি করে কয়েক মৌসুম পর্যন্ত মাটিতে টিকে থাকতে পারে। এ কারণে এ জীবাণু নির্মূল করা কঠিন। তাই এ ছত্রাক প্রতিরোধী জাত আবাদ করাই সবচেয়ে ভালো।

৩. আলুর মূল জটা রোগ (ROOT KNOT OF POTATO)
আলুর টিউবারে যদি অক্সিজেনের স্বল্পতা, অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড থাকে এবং অত্যাধিক তাপমাত্রা বিরাজ করলে আলুর মাঝখানে কিছু অংশ কালো হয়ে যায়। সাধারণত ফসল উত্তোলন হতে গুদামে সংরক্ষণের সময়ে এই রোগ দেখা দেয়। অনেক আলু একসাথে রাখলে ও এ রোগ হয়। এটি এক ধরনের পাকার আক্রমণ। এ পোকা মাটিতেই থাকে। মাটির অন্যান্য বহুকোষী ক্ষুদ্র প্রাণীর মধ্যে এটি অন্যতম। এ পোকা মূলত আক্রমণ করে আলুর মূলে। মূল থকথকে জেলির মতো বস্তুর মতো গুচ্ছবদ্ধভাবে এ পোকার ডিম থাকে। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলে আলু মূল ছিদ্র করে খাদ্য সংগ্রহ করে। মূলত গরম আবহাওয়ায় এ রোগ বেশি ছড়ায়।
আলুর শিকড় জড়ানো রোগ
আলুর মূল বা শিকড় জটা রোগ
লক্ষণ
আক্রান্ত আলু গাছের বৃদ্ধি থেমে যায়। হলুদাভ পাতা এবং নুয়ে পড়ার মতো লক্ষণ দেখা যেতে পারে। মূল ফুলে ফেঁপে ওঠে বা গোটা গোটা হয় অথবা গিঁট দেখা দেয়। এ কারণেই এ রোগের নাম মূল জটা বা গিঁট রোগ। আক্রান্ত আলুর গায়ে গুটি গুটি হয়। বালিমাটিতে আলু চাষ করলে এবং আবহাওয়ার তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ক্ষয়ক্ষতি
এ রোগ হলে আলু মান নষ্ট হয়, আকার ছোট এবং আলু ধরেও কম।  আক্রান্ত আলুতে সহজেই অন্যান্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ হয়। আর একই সঙ্গে ছত্রাক আক্রান্ত হলে আলু ও আলুর গাছের অবস্থা খুবই খারাপ হয়। অনেক ক্ষেত্রে আলুসহ সম্পূর্ণ গাছটিই নষ্ট হয়ে যায়।

প্রতিকার
তাপমাত্রা ৩০° সেলসিয়াসের মধ্যে আলু সংরক্ষণ করুন।
গুদামে সঠিকভাবে বাতাস চলাচল হচ্ছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
এ রোগের প্রতিরোধী আলুর কোনো জাত নেই। এর রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণও খুব কঠিন এবং ব্যয় সাপেক্ষ। এ কারণে এ রোগ থেকে ফসলকে মুক্ত রাখতে হলে জৈব নিরাপত্তাই উত্তম কৌশল।
আলু ক্ষেত রুট নট নেমাটোডে আক্রান্ত হচ্ছে কিনা তা নিয়মিত পরীক্ষা করুন।
কৃষি খামারের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার চেষ্টা করুন।
রুট নট নেমাটোডে একবার আক্রান্ত হয়েছে এমন ফসল দ্বিতীয়বার আবাদ করবেন না।
রুট নট নেমাটোড প্রতিরোধী বা প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছে এমন ফসল যেমন: সুদান ঘাস, বার্লি বা গম পর্যায়ক্রমে আবাদ করুন।

৪. আলুর অন্তর ফাঁপা রোগ (HOLLOW HEART OF POTATO)
অতিপরিমানে সেচ, মাত্রাতিরিক্ত নাইট্রোজেন সারের ব্যবহার হলে এবং তাপমাত্রা ঘনঘন পরিবর্তনের ফলে এ রোগ দেখা দেয়। এ রোগ আলুর টিউবারের কেন্দ্রে আঁকাবাঁকা অনিয়ত আকৃতির ফাঁপা অংশ সৃষ্টি করে। আলুর বীজ সঠিক সময়ের পূর্বে বপনের ফলে এ রোগ হয়।
আলুর ভেতর ফাঁপা রোগ
আলুর অন্তর ফাঁপা রোগ
কারণ
কোনো জীবাণুর কারণে এ রোগ হয় না। মূলত আলুর গুটি বড় হওয়ার সময় ঠিকমতো মাটিতে রস না পেলে বা অনিয়মিত রস পেলে অথবা আবহাওয়াগত কারণে আলুর ভেতরে এ সমস্যা তৈরি হতে পারে। আলু বড় হওয়ার সময় মাটিতে পানির অভাব হলে বৃদ্ধি ব্যাহত হয় ও স্ট্রেস তৈরি হয়। অতিরিক্ত পানি বা বেশি শুষ্কতার কারণেও এমন হতে পারে। পানির অভাবের পর হঠাৎ করে প্রচুর পানি পেলে হঠাৎ করে আলু দ্রুত বড় হতে শুরু করে।  তখন কেন্দ্রস্থলে ফাঁকা রেখে শরীরে বাড়ে আলু।

প্রতিকার
সঠিক সময়ে বীজ বপন।
পরিমিত পরিমাণে সেচ প্রদান ও সার প্রয়োগ।
দূরত্ব বজায় রাখে বীজ বপন।

৫. আলুর পাতা মোড়ানো রোগ (POTATO LEAF ROLL)
এটি Potato Leaf Roll Virus(PLRV) দ্বারা সংঘটিত হয়।এফিড জাতীয় পোকার আক্রমণে এই রোগ ছড়ায়। টিউবারের ভাস্কুলার টিস্যু ধ্বংস করে ফেলে। এটি টিউবারে Net necrosis তৈরি করে অর্থাৎ টিউবারে মৃত কোষ তৈরি করে। এ রোগের ফলে ৫০%-৮০% ফলন কমে যায়।
আলু পাতা মোড়া রোগ
আলুর পাতা মোড়া রোগ
লক্ষণ
প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে নতুন পাতার প্রান্ত উপরের দিকে (ঘড়ির কাঁটার বিপরীত) ভাঁজ হয়। বিশেষ কান্ডের কাছাকাছি পাতায় এ লক্ষণ আগে দেখা যায়। আক্রান্ত পাতা কিছুটা বিবর্ণ হয়ে যায় এবং ক্রমেই বেগুনী বা লালচে বর্ণ ধারণ করতে পারে। পাতায় হাত দিলে মচমচে মনে হতে পারে।
দ্বিতীয় ধাপে সব পাতাতে লক্ষণ দেখা যাবে। আক্রান্ত গাছের বৃদ্ধি থেমে যায়।

প্রতিকার
পোকা দমনে হলুদ আঁঠালো ফাঁদ ব্যবহার করতে হবে।
নিম তেল ৫ মিলিগ্রাম/লিটার পানি+৫ গ্রাম ডিটারজেন্ট বা সাবানের গুঁড়া মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
সুস্থ সবল গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করুন।
Imidacloprid গ্রুপের ওষুধ ০.৫ মিলিলিটার/লিটার পানিতে বা Thiamethozam গ্রুপের ওষুধ ০.২ গ্রাম/লিটার পানিতে কিংবা Melathion গ্রুপের ওষুধ ২ মিলিগ্রাম/লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।

৬. আলুর স্ক্যাব (SCAB OF POTATO)
Streptomyces scabies ব্যকটেরিয়ার দ্বারা এরোগ হয়। ক্ষার জাতীয় মাটিতে এই অনুজীব বেশি বেঁচে থাকতে পারে। আক্রান্ত টিউবার, বাতাস,পানির সাথে এ রোগ ছড়ায়।এটি আলুর চামড়ায় এবড়োথেবড়ো ফোস্কা তৈরি করে(Cork like lesion)। এ রোগটি মূলত মাটি থেকে হয়। এ জীবাণু কান্ড, শাখা ও মূলে আক্রমণ করে।
আলুর স্ক্যাব বা ঘুগড়ি পোকা খাওয়া রোগ
আলুর স্ক্যাব রোগ
লক্ষণ
আক্রান্ত আলু গায়ে খোসপাচড়ার মতো দাগ হবে। এটি গভীর বা হালকা হতে পারে। আবার দুটো মিলিয়েও হতে পারে।
ক্ষতস্থান শোলার মতো টিস্যু দিয়ে ঢাকা থাকতে পারে।
গভীর বা ছোট গর্তের মতো খোসপাচড়াগুলো একত্রে মিলে ফোসকার মতো ক্ষত তৈরি করতে পারে। এর চারপাশে থাকে শোলার মতো টিস্যু।

অনুকূল পরিবেশ
মাটির পিএইচ ৭ বা তার উপরে অর্থাৎ অত্যধিক ক্ষারীয় বা নিরপেক্ষ হলে এ রোগ বেশি হয়। তবে পিএইচ ৫ বা তার নিচে হলেও কিছু এ ব্যাকটেরিয়ার কিছু প্রজাতি আলুর ক্ষতি করতে পারে। মাটির পিএইচ ৫ থেকে ৫.২ এর মধ্যে ধরে রাখতে পারলে এ রোগ সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু পিএইচ ৫ থেকে ৮ এর মধ্যে চলে গেলে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

গরম আবহাওয়া ও শুষ্ক মাটি এ জীবাণুর জন্য খুবই অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।

প্রতিকার
রোগমুক্ত বীজ বপন।
মাটির PH ৫.২ বা তার নিচে রাখতে হবে।
অন্যান্য ফসল চক্রাকারে আবাদ করা। যেমন: সরিষা, ক্যানোলা ইত্যাদি।
পরিমিত পরিমাণে সেচ প্রদান।
মাটিতে বেশি চুন ব্যবহার না করা।
বেশি করে জৈব সার প্রয়োগ করা।

৭. আলুর সুতলি বা কাটুই পোকা
আলুর সুতলি পোকার মথ ছোট আকারের ও ধূসর বাদামী বর্ণের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকারক।কীড়া আলুতে ফুটো করে ও এর মধ্যে লম্বা সুরঙ্গ তৈরি করে।
আলুর সুতলি বা কাটুই পোকা
আলুর কাটুই পোকা
প্রতিকার
সংরক্ষণের সময়ে আলুর শুকনা বালু,ছাই,তুষ দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে।
নিমপাতা ব্যবহার করতে হবে।
আক্রান্ত আলু ফেলে দিন।
১ টন বালু+১ কেজি সেভিন(১০%)+১.৫ টন আলু রাখুন।

৮. আলুর নরম পচা রোগ (SOFT ROT OF POTATO)
Erwinia caratovora নামক ব্যকটেরিয়া দ্বারা এ রোগ হয়।আলুর টিউবারে ক্ষত সৃষ্টি করে। আক্রান্ত অংশের কোষ পচে যায়।ফলে বাজে গন্ধ সৃষ্টি করে।আলুতে চাপ দিলে পানি বের হয়। আক্রান্ত অংশ নরম ও ঘিয়ে রঙের হয়ে থাকে।
আলুর পচন রোগ
আলুর পচা রোগ
লক্ষণ
ভেজা নরম টিস্যু দেখে সহজেই এ রোগ শনাক্ত করা যায়। শুরুর দিকে একটি আলুর আক্রান্ত ও সুস্থ অংশ খালি চোখে সহজেই আলাদা করা যায়। ক্রমেই পুরো আলুতে রোগ ছড়িয়ে পড়ে। তখন আলুটি নরম ক্রিমি হয়। পচা দুর্গন্ধও ছড়াতে পারে। কারণ এসময় আলু ফেটে ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ে, সেই সঙ্গে অন্যান্য জীবাণু ও পোকামাকড়ও আক্রমণ করে।

আক্রান্ত আলু থেকে সহজেই গাছ ফুটে বের হয় না। বের হলেও সেটি নুয়ে পড়ে, টিস্যু বাদামী রঙ ধারণ করে, কান্ড শুকে যায় এবং শেষ পর্যন্ত গাছ মারা যায়। আলু রোপণের সময় ঠান্ডা আবহাওয়া (১০-১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) এবং মাটিতে বেশি রস থাকলে এবং চারা গজানোর সময় তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর থাকলে এ রোগ বেশি হয়।

প্রতিকার
রোগমুক্ত বীজ বপন।
পরিমিত সেচ প্রদান।
আগাম আলু চাষ।
টিউবার শোধনে ১% ব্লিচিং পাউডার বা৩% বরিক এসিড দ্রবণ ব্যবহার করতে হবে।

৯. আলুর শুকনো পচা রোগ (DRY ROT OF POTATO)
Fusarium sp. ছত্রাক দ্বারা এ রোগ সংঘটিত হয়। এতে টিউবারের চামড়া কুঁচকে যায়। আক্রান্ত স্থান পচে যায় ও বাদামী/ঘিয়ে/কালো রঙের দাগ দেখা যায়।বীজ পুরোপুরি পচে যায়।টিউবারের ভিতরে গর্ত সৃষ্টি হয়ে যায়।পচে যাওয়া স্থান প্রথমে ভেজা থাকলেও পরবর্তীতে শুকিয়ে শক্ত হয়ে যায়। আক্রান্ত অংশে ছত্রাকের জাল ও গোলাকার ভাঁজ থাকে।
আলুর শুকনা পচা রোগ
আলুর শুকনা পচা রোগ
লক্ষণ
প্রাথমিকভাবে আলুর গায়ে আঘাতের মতো চিহ্ন দেখা যায়। এরপর ধীরে ধীরে চিহ্নটি বড় হতে থাকে। আক্রান্ত অংশের ত্বকে শুষ্ক এবং ভাঁজ পড়ে। আক্রান্ত অংশে ছত্রাক রস শুকিয়ে ফেলে এ কারণে আলুর এ অবস্থা হয়। আক্রান্ত অংশের ভেতরের দিকে হালকা বাদামী থেকে কালো বর্ণ হয়। এর কারণে ছত্রাক ক্রমেই কোষ মেরে ফেলতে শুরু করে। শুষ্ক গর্তের ভেতরে নানা রঙ দেখা যেতে পারে।
আক্রান্ত অংশ শুষ্ক হয়। তবে অতিরিক্ত আর্দ্রতা থাকলে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ হবে এবং ভেজা অংশ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াবে। আক্রান্ত অংশ বাদ না দিলে দ্রুত পুরো আলুই নষ্ট হয়ে যাবে।
মাঠে এ রোগের লক্ষণ বুঝতে হলে গাছের অঙ্গুরোদগমের দিকে খেয়াল করুন। আক্রান্ত বীজ থেকে চারা বের হবে না। বের হলেও গাছের আকার ছোট বড় হবে। গাছ নুয়ে পড়তে পারে। এতে বৃদ্ধি ব্যাহত হবে।

অনুকূল পরিবেশ
এ রোগের জীবাণু আলু বীজ বা মাটি থেকে হতে পারে। মূলত বীজ কেটে রোপন করলে বা ফসল সংগ্রহ ও সংরক্ষণের এ ছত্রাকের আক্রান্ত হতে পারে। সংরক্ষণের সময় আঘাত পেলে ক্ষতস্থান ছত্রাক আক্রান্ত হতে পারে।
পরিবেশের তাপমাত্রা ১৫-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে এবং আপেক্ষিক আর্দ্রতা বেশি থাকলে ফিউজারিয়াম ড্রাই রট ছত্রাক আক্রমণের সম্ভাবনা বাড়ে। তবে স্টোরেজে তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকলেও এ ছত্রাকে আক্রান্ত হতে পারে।
ফিউজারিয়াম ছত্রাক মাটিতে বছরের পর বছর বেঁচে থাকতে পারে। এ কারণে আলু বীজ কেটে রোপণ করলে আক্রান্ত মাটি থেকে সহজেই বীজ আক্রান্ত হয়। আবার আক্রান্ত মাটিতে আবাদ করলে ফসল সংগ্রহের সময় আলুর গায়ে লেগে থাকা মাটির মাধ্যমে এ ছত্রাকের স্পোর স্টোরেজে গিয়ে সব আলুর ক্ষতি করতে পারে।

প্রতিকার
রোগাক্রান্ত আলু ফেলে দিতে হবে।
বীজ শোধন করতে Dithane M45 ০.২% ব্যবহার করতে হবে।
গুদামজাত,বস্তা ও ঝুড়িতে রাখা আলু ৫% ফরমালিন দ্বারা শোধন করতে হবে।

Post a Comment

0 Comments