সাম্প্রতিক

6/recent/ticker-posts

পশুর ওজন মাপার বিভিন্ন পদ্ধতি, কোনটি নির্ভুল

ফিতা দিয়ে গরুর ওজন বের করার সূত্র
ফিতা দিয়ে গরুর ওজন পরিমাপ

খামারের পশুর সঠিক ওজন জানা খুব জরুরি। কারণ ওজন জানা না থাকলে ওষুধের ডোজ, খাবারের পরিমান, শরীরের বৃদ্ধি এসব বিষয় বুঝা সম্ভব হবে না।

জন্মের পর থেকে প্রতিদিনই গবাদিপশুর শরীর বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে দৈহিক ওজন বাড়তে থাকে। গবাদিপশুকে যে খাদ্য খাওয়ানো হয় তার একটি অংশ মলমূত্র হয়ে শরীর থেকে বের হয়ে যায় এবং অপর অংশ শরীর গঠনে ব্যয় হয়। যে অংশ পশুর শরীর গঠনে ব্যবহৃত হয় তা পশুর দৈহিক বৃদ্ধি ঘটায়। যে পশু দিন দিন খাবার খেয়ে বড় হয়ে ওঠে তার শারীরতত্ত্ব স্বাভাবিক চলে। গবাদিপশুর দৈহিক ওজন প্রায় সময়ই পরিমাপ করতে হয়। যেমন- জন্ম, বয়ঃবৃদ্ধি, গরম হওয়া, যৌন পরিপক্বতা, অন্তঃসত্ত্বা হওয়া প্রভৃতির সময়। গরুমহিষের ওজন দুভাবে নির্ণয় করা যায়। যথা: ১. ওজন মাপার যন্ত্র বা তুলাদণ্ড বা পাল্লা বা ডিজিটাল ওজন স্কেলের সাহায্যে এবং ২. দৈর্ঘ্য ও বুকের বেড় পরিমাপের মাধ্যমে।

গরু-মহিষের ওজন তুলাদণ্ডের সাহায্যে পরিমাপ করলে একেবারে নির্ভুল ওজন পাওয়া যায়। যেখানে গরু-মহিষ পালন করা হয় সেখানে একটি নিরাপদ স্থানে তুলাদণ্ডটি মাটিতে স্থাপন করা যেতে পারে। গরু-মহিষকে তুলাদণ্ডের উপরে উঠিয়ে ওজন নিতে হয়। তুলাদণ্ডের ব্যবস্থা না থাকলে না থাকলে দৈর্ঘ্য ও বুকের বেড় পরিমাপের মাধ্যমেও গরুমহিষের ওজন নির্ণয় করা যায়। তবে এক্ষেত্রে তুলাদণ্ডের মতো নির্ভুল ওজন পাওয়া যাবে না। এ পদ্ধতিতে প্রাপ্ত ওজন প্রকৃত ওজনের চেয়ে ৫% কমবেশি হতে পারে।

ওজন মাপার বেশ কয়েকটি পদ্ধতি সারা বিশ্বের প্রচলিত আছে। ওজন স্কেলে তুলে গরুর ওজন মাপলে সঠিক নির্ভুর ওজন পাওয়া যায়। কিন্তু সব সময় ওজন স্কেল থাকে না বা ছোট খামারির ক্ষেত্রে এটি একটি বাড়তি খরচ হয়ে যায়। তাছাড়া আপনি যদি বাজারে বা কোথাও গিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পশুর ওজন সম্পর্কে ধারণা পেতে চান তাহলে কী করবেন? এর জন্য রয়েছে বিকল্প কয়েকটি পদ্ধতি। অবশ্য পশুর জাত, স্বাস্থ্য, খাবারের ধরন এবং ওজন মাপার পদ্ধতি ভেদে পরিমাপ আলাদা হতে পারে।  তাছাড়া ডিজিটাল ওজন স্কেলের মাপের সঙ্গে টেপ ফিতার সাহায্যে সূত্র ও টেবিল ব্যবহার করে হিসাব করা ওজনের সামান্য পার্থক্য থাকে।

টেপ ফিতা দিয়ে পরিমাপের সময় সতর্কতা
১. গরুর মাথা যেন সমান্তরাল থাকে। অর্থাৎ খাওয়ার সময় যেমন মাথা নিচু করে থাকে সেরকম যেন না থাকে। কারণ গরু যখন মাথা নিচু করে থাকে তখন এর বুক প্রসারিত হয়।
২. বুকের বেড় মাপতে হবে ঠিক ঘাড় বরাবর। কখনোই পিঠ বা ঘাড় থেকে তলপেটের মাপ নিবেন না। তাতে ভুল ওজন আসবে।
৩. খেয়াল করুন ফিতাটি যেন গরুর গায়ের সঙ্গে লেগে থাকে। ফিতা বেশি টাইট হলে ওজন কম আসবে আবার বেশি ঢিলা হলে ওজন বেশি আসবে।
৪. ওজন মাপার আগে ১২ ঘণ্টা না খাইয়ে রাখতে হবে। অবশ্য সকালে খাবার দেওয়ার আগে মাপলেও চলে।
গরুর বুকের বেড় ও শরীরের দৈর্ঘ্য মেপে ওজন নির্ণয়
বুকের বেড় ও দৈর্ঘ্যের মাপ

ওজন মাপার বিশেষ ফিতাও রয়েছে। বিভিন্ন ব্রিডের (জাত) গরুর ওজন মাপার ফিতা আলাদা। তাছাড়া বাছুর, বকনা এবং গাভীর জন্য অর্থাৎ ওজন ভেদেরও টেপ আলাদা হতে পারে। জাত ও বয়স ভেদে শরীরের গঠন আলাদা হয়। এমনকি বিভিন্ন পশুর ওজন মাপার জন্যও আলাদা ফিতা রয়েছে। তবে এভাবে ওজন মাপলে কখনো কখনো প্রকৃত ওজনের সঙ্গে অনেক ফারাক থাকে। নিচের ওজন মাপার বিভিন্ন পদ্ধতি বর্ণনা করা হলো:

ওয়েইট ব্রিজ
এটি একটি স্ট্যান্ডার্ড ক্যালিব্রেটেড স্কেল। এটি আসলে ওজন স্কেল। খালি পেটে রাখা পশুকে শান্তভাবে সরাসরি ওজন স্কেলের উপর তুলে দাঁড় করিয়ে দিতে হবে। ১-০-১৫ সেকেন্ড দাঁড় করিয়ে রাখতে হবে। ডিসপ্লে দেখানো ওজন রেকর্ড করুন।
ওয়েটব্রিজ বা ওজন স্কেল দিয়ে গরুর ওজন পরিমাপ
ওয়েটব্রিজ পদ্ধতিতে গরুর ওজন পরিমাপ

আগরওয়ালের সূত্র
এটি ভারতীয় গবাদি পশুদের জন্য তৈরি শেফারের সূত্র। লাইভ ওজন পরিমাপ করার জন্য যে সমীকরণটি ব্যবহৃত হয় তা হলো: W = (বুকের বেড় × দৈর্ঘ্য) / Y। যেখানে W শরীরের ওজন (কেজিতে), Y এর মান ৯ যদি বুকের বেড় ৬৫ ইঞ্চির চেয়ে কম হয়, আর বুকের বেড় ৬৫ থেকে ৮০ ইঞ্চির মধ্যে হলে Y এর মান ৮.৫। এছাড়া বুকের বেড় ৮০ ইঞ্চির বেশি হলে Y হবে ৮।

শেফারের সূত্র
লাইভ ওজন গণনার জন্য এ সূত্রটিই সর্বাধিক ব্যবহৃত হয়। শেফারের সূত্রটিও বেশ সহজ। সমীকরণটি হলো W = (L × G×G) / 300, যেখানে W শরীরের ওজন (পাউন্ডে), L প্রাণীর দৈর্ঘ্য- কাঁধের শুরু থেকে পেছনের উঁচু হাড় অবধি।  G  হলো বুকের বেড়। দৈর্ঘ্য ও বেড় ইঞ্চিতে মাপতে হবে। সূত্রে মান বসালে ওজন বের হবে পাউন্ডে। চূড়ান্ত ওজন কেজিতে রূপান্তর করে নিতে হবে। এক কেজি = ২.২০৫ পাউন্ড। [প্রথম ছবিটিতে শেফারের পদ্ধতি দেখানো হয়েছে।]

রোনডো টেপ
এটি বিশেষ ধরনের একটি ফিতা। এ ফিতায় দৈর্ঘ্যের বিপরীতে ওজন দেওয়া থাকে। সকালে খালি পেটে পরিমাপ করতে হবে। পশুর মাথা স্বাভাবিক অবস্থায় অর্থাৎ সোজা রেখে এবং চারটি পা শরীরের নিচে চতুর্ভূজ আকারে ছড়িয়ে থাকে যেন সেটি খেয়াল রাখতে হবে।  রোনডো টেপটি কাঁধের সামান্য পিছন থেকে নিচের বুকের পাশ দিয়ে জড়িয়ে নিতে হবে। যে অংশে দূরত্ব সবচেয়ে কম সেই অংশের মাপ নিতে হবে। এবার মাপটির সঙ্গে টেপে দেখানো ওজন মিলিয়ে নিলেই চলবে।
রোনডো টেপ দিয়ে সহজেই বিভিন্ন পশুর ওজন পরিমাপ করা যায়
রোনডো টেপ

ওজন টেপ
এ পদ্ধতিতে পশুর বুকের বেড় এবং দৈর্ঘ্য (কাঁধের উঁচু হাড় থেকে  পেছনের উঁচু হাড় পর্যন্ত) পরিমাপ করা হয়। মাপ হবে ইঞ্চিতে। উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক, বুকের বেড় ৬২ ইঞ্চি এবং দৈর্ঘ্য ৭৮ ইঞ্চি। দৈর্ঘ্য ডেসিমেল এককে  রূপান্তর করতে লিখতে হবে (৭ × ১০) + ৮। বুকের বেড়ের বিপরীতে দৈর্ঘ্যের এ ৭ সংখ্যাটি বডি ওয়েট চার্টে মেলালে পাওয়া যাবে ৪১.০। একইভাবে, একই বুকের বেড়ের বিপরীতে দৈর্ঘ্য ৮ এর মান পাওয়া যাবে 8৭।  প্রাপ্ত মানগুলি থেকে চূড়ান্ত ওজন পেতে এ সূত্রটি ব্যবহার করতে হবে: W = (৪১.০ × ১০) + ৪৭ = ৪৫৭ কেজি।

ক্যালকুলেটর কৌশল
এই কৌশলটিতে বুকের বেড় পরিমাপ করে গরুর দেহের ওজন সম্পর্কিত টেবিল থেকে মান বের করতে হবে।
টেবিলের মান থেকেও গরুর ওজন বের করা যায়
বুকের বেড়ে বিপরীতে ওজনের টেবিল
আরো পড়ুন: 
গরুর খাবারের সহজ হিসাব
গরুর লাম্পি স্কিন রোগ
গর্ভবতী গাভীর যত্ন

Post a Comment

0 Comments