সাম্প্রতিক

6/recent/ticker-posts

মাটি ছাড়া ঘাস চাষ (হাইড্রোপনিক ঘাস)

হাইড্রোপনিক (hydroponic) পদ্ধতিতে মাটি ছাড়াই ঘাস চাষ
তাক সাজিয়ে হাইড্রোপনিক ঘাস চাষ       ছবি : সংগৃহিত

গবাদিপশুর খামার করতে গেলে সবার আগে ঘাসের নিজস্ব ব্যবস্থা থাকা জরুরি। তা না হলে খামার লাভজনক করা প্রায় অসম্ভব। নেপিয়ার, জার্মান,  ইপিল ইপিল, পারা, জাম্বো, গিনি, ভুট্টা বা আলফালফা চাষ করা যেতে পারে। এই ঘাসগুলা বহু বর্ষজীবী অর্থাৎ একবার লাগালে কয়েক বছর পর্যন্ত কেটে খাওয়ানো যায়। আর এক বছরের মধ্যে কয়েকবার কাটা যায়।


কিন্তু ঘাস চাষ করার মতো জমি যদি না থাকে, এছাড়া শুষ্ক মৌসুমে যেকোনো ঘাসের উৎপাদন কমে যায়। তখন ঘাসের সংকটে পড়তে পারেন। 

এই সমস্যার একটি সহজ সমাধান হলো হাউড্রোপনিক পদ্ধতিতে ঘাস চাষ। বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে সারা বিশ্বেও এখন এটি জনপ্রিয় হচ্ছে । ডেইরি, গরু মোটাতাজাকরণ, ছাগল, গড়াল, টার্কি, মুরগী, খরগোশ পালনে অত্যন্ত পুষ্টিমান সম্পন্ন গ্রিন ফডার হিসেবে এই পদ্ধতিতে চাষ করা ঘাস সরবরাহ করা যেতে পারে।

হাইড্রোপনিক পদ্ধতি মানেই বুঝায় মাটি ছাড়া শুধু পানি দিয়ে চাষ। ভালো ফল পেতে পানির সাথে সাপ্লিমেন্ট পুষ্টি (সার/খনিজ) যোগ করা যেতে পারে। 

এই পদ্ধতিতে খুব সহজে, অল্প জায়গায়, অল্প খরচে এবং কম সময়ের মধ্যে মান সম্মত পশুখাদ্য পেতে পারি। এর পুষ্টিগুণ সাধারণ উচ্চফলনশীল (উফশী) ঘাসের চেয়ে বেশি। তাছাড়া কীটনাশক, কৃমি এবং অন্যান্য পরজীবীমুক্ত অবস্থায় এই ঘাস উৎপাদিত হয় বলে এতে পুষ্টিমানও থাকে বেশি।

হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে গম, বার্লি, ভুট্টা বা গিয়েনা বীজ থেকে এই ঘাস উৎপন্ন করা যায়। এটি প্রোটিন, খনিজ লবণ, এনজাইম, ভিটামিন এ এবং ই-সমৃদ্ধ। এক কেজি বীজ থেকে মাত্র সাত অথবা আট দিনে সাত কেজি তাজা ঘাস উৎপাদন সম্ভব।

উপকরণ:
১. ২ কেজি পরিমান গম বা ভুট্টা (চারা গজাবে এমন)
২. কিছু পানি
৩. প্লাস্টিকের ট্রে বা ট্রের মতো পাত্র (৩'×২'×৩")
৪. ঠান্ডা ও ছায়া যুক্ত পরিবেশ
৫. একটি নিংড়ানো পুরান তোয়ালে বা চটের বস্তা
৬. বালতি বা গামলা

চাষ পদ্ধতি
দিনের প্রথম ভাগে অর্থাৎ সকালে প্রথমে ভুট্টা বা গম ভালো করে ধুয়ে ৬-৭ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখবেন। বিকেলে পানি ঝরিয়ে ট্রেতে সমানভাবে ছড়িয়ে তার উপরে ভেজা তোয়ালে বা চট দিয়ে ঢেকে ঠান্ডা ছায়াযুক্ত স্থানে রেখে দিতে হবে। এভাবে রাখলে এক দিনের মধ্যে বীজের অঙ্কুরদগম (গজানো) হওয়ার কথা। চারার দৈর্ঘ্য ১-১.৫ ইঞ্চি হলে চট সরিয়ে রাখতে হবে। আর বীজের অঙ্কুরদগমের পর থেকে ৩-৪ ঘণ্টা পর পর পানি স্প্রে বা ছিটিয়ে দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যেন পানি ট্রেতে জমে না থাকে। ট্রে একদিকে সামান্য ঢালু করে শেষ প্রান্তে নিচের দিকে ছোট কয়েকটি ছিদ্র করলে অতিরিক্ত পানি এমনিতে ঝরে যাবে। বাঁশের ফ্রেম করে তাক বানিয়ে শেলফের মতো করে অনেকগুলো ট্রে সাজিয়ে রাখা যেতে পারে। চাইলে লোহা বা কাঠ দিয়ে আরো ভালো একটা সিস্টেম বানিয়ে নিতে পারেন। স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি স্প্রে করার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। ইউটিউবে খুঁজলে অসংখ্য ভিডিও পাবেন। যাই হোক, ঠিকঠাক পানি স্প্রে করলে সাত থেকে নয় দিনের মধ্যে ৬-৯ ইঞ্চি হবে। তখন খাওয়ানোর উপযুক্ত হবে।
এক কেজি পরিমান ভুট্টা বা গমে ৭-১০ কেজি পরিমাণ গ্রিন ফোডার পাওয়া যেতে পারে। আর যদি তাক বানিয়ে ট্রে সাজাতে পারেন তাহলে অবশ্যই প্রত্যেকটি তাকে ট্রে সাজানোর মাঝখানে হিসাব করে দিনের ব্যবধান রাখবেন। তাহলে  ঘাস পাওয়ার জন্য আর সাত দিন অপেক্ষায় থাকতে হবে না। একটি তাক শেষ হতেই আরেকটি খাওয়ানোর উপযুক্ত হবে। যেমন : সাতটি তাক হলে এক দিনের ব্যবধানে ট্রে সাজাতে হবে। তাহলে সাত দিন পর দৈনিক একটি তাক থেকে ঘাস সংগ্রহ করতে পারবেন।

হাইড্রোপনিক গ্রিন ফোডারের উপকারিতা:
১. এতে প্রোটিনের (আমিষ) পরিমান ৩১.৯৯% আর সাধারণ ঘাসে প্রোটিন থাকে ১১.৫%
২. এনার্জি (শক্তি) : ৪৭২৭ কিলোক্যালরি/কেজি আর সাধারণ ঘাসে ২৬০০ কিলো ক্যালরি/কেজি
৩. তাই সাধারণ ঘাস দিনে তিন বার লাগে আর এটা দুই বার দিলে হবে
৪. ২৪০ কেজি পরিমাণ ঘাস ফলাতে জমি লাগে ২১৭৮ বর্গফুট আর সমপরিমাণ গ্রিন ফোডার ফলাতে ২২৯ বর্গফুট জায়গা (ছায়াযুক্ত স্থান বা ঘরেও করা যেতে পারে)
৫. সাধারণত ৮০ লিটার পানি খরচ করে যে পরিমাণ ঘাস পাওয়া যায়। সে পরিমান গ্রিন ফোডার ফলাতে মাত্র ৩ লিটার পানি লাগে
৬. ৭-৯ দিনে এই ফোডার যে পরিমাণ বাড়ে, সে পরিমান সাধারণ ঘাস বড় হতে লাগে ৩৭-৪০ দিন
৭. গ্রিন ফোডার নিরাপদ, ফুড পয়জনিংয়ের সম্ভাবনা নাই। দূষণ মুক্ত।  (তবে সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়)
৮. এটা সহজে পশুকে পরিবেশন করা যায়। কাটা কাটির দরকার হয় না
৯. এটা পশুর স্বাস্থ্য ভাল করে এবং দ্রুত প্রজনন ক্ষম করে কারন এতে অনেক ভিটামিন উপাদান আছে
১০. ১ কেজি ফডারের উৎপাদন খরচ ২.৫-৪ টাকা
১১. এর মাধ্যমে খামারের শ্রমিক ও অন্যান্য খরচ উল্লেখযোগ্য ভাবে কমানো যায়
১২. সারা বছর এটা উৎপাদন করা যায়

সতর্কতা 
হাইড্রোপনিক ঘাসে আমিষের পরিমান অনেক বেশি থাকে কিন্তু ফাইবারের (আঁশ) কম থাকে। এ কারণে ননরুমিনেন্ট (অরোমন্থক প্রাণী) প্রাণী যেমন : খরগোশ, গিনিপিগ, টার্কি, মুরগীর জন্য স্বাস্থ্যকর হলেও রুমিনেন্ট পশু যেমন : গরু, ছাগলের জন্য হজমে সমস্যা তৈরি করতে পারে। এছাড়া ছত্রাকের (মোল্ড) সমস্যাও হতে পারে।

হাইড্রোপনিক ঘাসের সাধারণ কিছু সমস্যার সমাধান পেতে এই লিংকে ক্লিক করুন

Post a Comment

1 Comments